সবরের আগুন

শ্রীর্গামোহন মুখোপাধ্যায় বি-এ,

ভীত লাহক্র্রেল্ী

২*৪নং কর্ণওয়ালিশ ফ্রী, কলিকাতা

প্রকাশক শ্রীনির্মলচন্ত্র চক্রবস্তা »২1১ নং টালিগঞ্জ রোড, কলিকাতা!

প্রিপ্টার-_গ্রীশশধর চক্রবস্তী কালিক প্রেস ২০, ডি. এল. রায় স্্রীটু, কলিকার্তী

ভূমিকা

“সুরের আগুন” রাশিয়ার জগদ্বিখ্যাত কথাশিল্পী খষি টলষ্টয়ের সর্বজনপ্রিয় উপন্যাস 1) 70:908287 907089র অনুবাদ বাঙালী পাঠক বিচার ক।4বেন--ইহা! সরল, শ্বচ্ছন? সাবলীল করিবার চেষ্টা কতদূর সফল হইয়াছে

ংলায় অনুবাদ সাহিত্য যে এখনও খুবই কম, ইহাতে বোধ হয় মতদ্বৈধ নাই। এইজন্তই আমার অনুদিত প্টলগ্টয়ের গল্প” পাঠ করিয়া অনেকেই আমাকে টলষ্টয়ের অন্যান্য রচন! বাঙালী পাঠককে উপহার দিতে বলেন, তাহাদের উৎসাহের ফর্লেই এই পসুরের আগুন” প্রকাশিত হইল।

ইহা! বাঙালী পাঠক-পাঁঠিকার সমাদর পাত করিলে নিজেকে ককতার্থ মনে করিব। ইতি-_

রত্বপুর, বরিশাল বিনীত আশ্বিন, ১৩৪৩ জ্রীদুর্গামোহন মুখোপাধ্যায়

তখন শীত যায় যায়।

আমরা রেল-গাড়ীতে চলিয়াছি। ছুইদিন এক রাব্রি কাটিয়া গিয়াছে, কিন্তু গাড়ী চলিয়াছেই কি দীর্ঘ এই পথ! কত ্রেশনে কত লোক উঠিল, কত লোক নামিয়! গেল; কিন্তু এই পথের প্রথম থেকেই আমরা একটি গাড়ীতেই আছি, কখনও শুইয়া আবার কখনওবা বঙিয়। |

সুরের আগুন

আমাদের গাড়ীতে আমি ছাড়! আরও তিনজন প্রথম থেকেই ছিলেন। এই তিনজনের একজন ছিলেন মহিলা তীর ভরা! যৌবনে তখন অনেকটা ভাট! পড়িয়াছে, বহুদিনের ছুঃখ ভোগের লিন ছায়। তার মুখখানি ঢাকিয়! রাখিয়াছে। সঙ্গে তারই বন্ধু একজন তদ্রলোক বসিয়া আছেন। ভদ্রলোকটার বয়সও প্রায় চষ্টিশ, তার কাপড় চোপড় একেবারে নুতন ঝক্ঝকে তকৃতকে। আর একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকও সেখানে ছিলেন! বয়সে তিনি বুদ্ধ হন নাই বটে, তবে বার্ধক্যের পৃর্বেই তাঁর কৌকড়ান চুলগুলি পাকিয়া গিয়াছিল। ইনি গাড়ীর একপাশে, সকলকে ছাড়িয়া আলাদা হইয়া বসিয়াছিলেন। মাঝে মাঝে গাড়ীর ভিতরে এ-জিনিস-স্ জিনিসের দিকে, কখনও জানাল! দিয়া বাহিরের দিকে চাহি ধাঁকিতেন, আবার কখনও বা বই কিংবা খবরের কাগজ লইয়া এক মনে পড়িতেন। যাই হোক, ক্টীবে মাঝে তিনি কি এক অদ্ভুত শব করিতেছিলেন-_সেটা কাসি, কি হাসি, কি কান্না তাহা কিছুই বুঝিতে পারা গেল না। তীর হাব ভাব দেখিয়া এটা স্পষ্টই বুঝা গেল যে, আর কোন যাত্রীর সঙ্গে কথাবার্তী কহিতে তিনি নিতান্তই ন্যর!জ।

কেহ কোন কথ! ছিজ্ঞাসা' করিলে তিনি খুব সংক্ষেপে এবং রুক্পভাবে জবাব দিয়াই, হয় জানাল! দিয়! মুখ বাহির করিয়। চাহিয়। থাকেন, ন! হয়, নিজের বইখানি পড়িতে আরস্ত করেন, কিংবা একটা নিতান্ত পুরাতন ব্যাগ থেকে চা তৈয়ারি করিবার ছিনিসপত্র সব বাহির করেন। এইভাবে প্রায় একদিন কাটিয়া গেল। কি অন্ভুত লোক !

আমি বে বেঞ্চিতে বসিয়াছিলাম তারই সামনের বেঞ্চিতে এক- কোণে তিনি বসিয়াছিলেন। তাঁর সঙ্গে একটু আলাপ করতে আমার

| সুরের আগুন বড়ই ইচ্ছা হইতেছিল। কয়েকবার চেষ্টাও করিলাম, কিন্তু যতবারই তার সঙ্গে চোখে চোখে দেখা হইল ততবারই তিনি মুখ ফিরাইয়! লইয়া তার বইয়ে মন দিলেন, কিংবা জানালা দিয়] বাহির দিকে চাহিয়া রহিলেন।

ধর ভার হার লাজ চায়ের অল আনিবার জন্য ভদ্রলোকটি একবার নামিলেন।

মহিলা এবং তার বদ্ধুটিও নামিয়। স্টেশনের খাবারের ঘরে ঢুকিলেন। একটু পরে জানিতে পারিলাম যে নূতন পোষাক পরা এই. উত্তলোকটি একজন ব্যারিষ্টার। তারা নামিয়! যাইতেই, অনেক নূতন

যাত্রী গাড়ীতে উঠিল। এই নূতন যাত্রীদের মধ্যে 'এক্দন ছিলেন খুবই ঢেও! এবং বুড়া, তার গায়ে একটা লঙ্বখ (কোট। তাঁর কথখাবার্থ। শুনিয়৷ বেশ স্পষ্ট বুঝিতে পারা গেল স্ব তিনি একজন সদাগর। তাঁর প্রকাও ব্যবসায় আছে। যে, বেঁ্চিতে মহিলা! এবং তার ব্যারিষ্টার বন্ধুটি বসিয়াছিলেন তারই ঠিক:্লীমনের বেঞ্চিতে সেই সদাগর বলিলেন। তাঁরই একপাশে একটি ফুখক বসিয়াছিল। কোন এক সদাগরের কেরাণী বলিয়াই তাকে মনে হইল। বৃদ্ধ ব্যবসায়ী এই যুবক কের!ণীর সঙ্গে গল্প আরস্ত করিয়। দিলেন। আমি তাদের সাযনের বেঞ্চিতে অল্প একটু তফাতে ছিলাম তখন ট্রেণ থামিয়াছিল বলিয়! আমি তাদের কথাবার্ড1! খানিকট। শুনিতে পাইলাম

বৃদ্ধ বণিকটি যাচিয়াই বলিতে লাগিলেন যে, পরের ্টেশনের নিকটেই তীর জমিদারি আছে, তিনি সেই জমিদারিতেই যাইতেছেন। তারপর ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি লইয়া! তারা কথাবার্তা আরম্ভ করিত্লেন। একটু পরেই তাদের কথা আরম্ভ হইল একটা মেলা সন্বন্ধে। সেবার সেই মেলায় এক ধনী সদাগর তার বন্ধুদের লইয়া পাল্প! দিয়া. কি ররম

স্থবরের আগুন

মদ খাইয়াছিলেন এবং কত ধুমধাম করিয়াছিলেন, কেরাণীটি তাই একটু বিশদভাবে বর্ণনা করিল। কিন্তু বৃদ্ধ বণিক তার কথা শেষ হইতে না হইতেই বলিতে আরস্ত করিলেন-_-“এ আর কি! আমাদের বয়সের কালে এক একট! মেলায় এক একট! বড়লোক মদে আর মেয়ে মাঙ্গষে কি টাকাটাই না খরচ করেছে! তার তুলনায় এখন আর কি হচ্ছে ছাই? আমিও অনেকবার এরকম আমোদ করেছি। এখন বুড়ো হয়ে পড়েছি আর সে শ্ফুর্তি নেই, সে উৎসাহ নেই।”

এই কথা বলিয়া তিনি নিজেই খুব গর্ব্ব অনুভব করিতে লাগিলেন তাই কেরানীটিকে আর মোটেই কথা কহিতে না৷ দিয়া তিনি নিজেই" আবার বলিতে লাগিলেন,-“দেখ একবার মদ খেয়ে এমন কাণ্ড ক'রে ফেলেছিলুম যে, তা আর লোকের সামনে বলা যায় না।”

কেরাম্মীটির কাণে কাণে তিনি তারপর কি বলিলেন! শুনিয়া সে একেবারে হো হো করিয়া এমনি হাসিল যে গাড়ীটার একদিক থেকে আর এক দিক পর্য্যস্ত বাজিয়] উঠিল। বৃদ্ধ নিজেও দাতগুলি সবই একেবারে বাহির করিয়! হাঃ হাঃ করিয়া খানিকক্ষণ হাসিলেন।

তাদের এই কথাবার্ভ আমারত একেবারেই ভাল-লাগিল না। তাদের কাছে কোন ভাল কথা শুনিব আশাও আমার আর রহিল না। আমি ভাবিলাম যতক্ষণ ট্রেণ্‌টি ষ্টেশনে থাকিবে ততক্ষণ প্লাটফনৃমে খানিকটা পায়চারী করিব। উঠিয়! গাড়ীর দরজা অবধি গিয়াছি, এমন সময়েই দেখিলাম সেই মহিলা! এবং তার ব্যারিষ্টার বন্ধুটি স্টেশনের খাবার খর থেকে বাহির হইয়া! গাড়ীর দিকে ফিরিয়া আসিতেছেন। তারা কথ! কহিতেছিলেন আর প্রাণ খুলিয়া হাসিতেছিলেন।

আমাকে নামিতে দেখিয়াই ব্যারিষ্টার বলিলেন, প্যাচ্ছেন কোথা মশায় ?.. আর সময় নেই, এখুনি শেষ ঘণ্টা পড় বে।”

সবরের আগুন

সত্যই খানিকটা যাইতে না যাইতেই শেষ ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। আমি তাড়াতাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। আসিয়াই দেখি মহিলাটি 'আর ব্যারিষ্টার খুব গল্প করিতেছেন। তাঁদের মুখে চোখে আনন্দ আর ধরে না।

সেই বালিকাটি তাঁদের সামনে বলিয়। তাঁদেরই কথাবার্তা সুনিতেহিলেন, আর মাঝে মাঝে নাক সিটুকাইয়া, মুখ বীকাইয়া, ভ্রাকুঁচকাইয়। তাঁর নীরব অসম্মতি প্রকাশ করিতেছিলেন। _. আমার, বসিবার জায়গায় আমি ফিরিয়া আসিতেছি তখন একটু হাসিয়। ব্যারিষ্টারটি মহিলাকে বলিলেন, “তারপর সে তার স্বামীকে সোজা বলে দিলে যে তার সঙ্গে সে একজে আর থাকৃতে পারবেনা, থাকৃবেও না। কারণ---” .

বাকীটা আর শুনিতে পাইলাম না, কাট আমিও যেমনি আসিয়া আমার জায়গায় বসিলাম, অমনি কয়েকঞ্জঝী নুতন যাত্রী িনিস্পত্র লইয়৷ গাড়ীতে উঠিল; আর খানিকক্ষণ ঝ্লিয়া সেখানে এমন একটা হট্টগোল বীধিয়া গেল যে, আর কোন খাঁধাই আমার কাশে আসিয়া পৌছিল না। গোলমাল থামিয়া যাওয়ার পর আবার ব্যারিষ্টারের কথ! শুনিতে পাওয়া গেল। প্রথমে একটি মহিলা আর তার স্বামীর বিবাহু-বিচ্ছেদের কথা৷ হইতেছিল, এবারে সাধারণ তাবেই স্বাধীন বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদের কথ! আরম্ভ হইল।

ব্যারিষ্টার ভদ্রলোকটি বলিতেছিলেন যে, সমস্ত ইউরোপেই এখন বিবাহু-বিচ্ছেদের সমস্যা সকল লোকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে এমনকি এই রুশ দেশেও বিবাহ-বিচ্ছেদ এখন আগের চেয়ে বেশী হইতেছে।

তিনিত খুব বলিতে লাগিলেন। তখন গাড়ীর ভিতরে সমস্ত

সুরের আগুন

গোলমাল থামিয়া গিয়াছে, আর গাড়ীর দসবন্ত লোকই তখন তীর মুখের দিকে চাহিয়া আছে। তার কিন্ত এটা একেবারেই খেয়াল ছিল না। তারপর তিনি যখন বুঝিলেন যে, শুধু তিনিই বক্তা এবং আর সকলেই নীরব শ্রোতা তখন তিনিও চুপ করিলেন।

তারপর একটু হাসিয়৷ বৃদ্ধ বণিকের দিকে ফিরিয়া তিনি বলিলেন, “আগেকার দিনে সব ব্যাপার নিশ্চয়ই ছিল না, কি বলেন ?”

ব্যবসায়ী ভত্রলোকটি উত্তর দিতে যাইতেছিলেন এমন সময় ট্রেণ ছাড়িয়। দিল। তিনি অমনি মাথ! থেকে টুপীটা খুলিয়া হাতে লইয়। মনে মনে কি এক অন্তর আওড়াইতে লাগিলেন। ব্যারিষ্টার মহাশয় ততক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তারপর তার প্রার্থন। শেষ হইলে টুগীটা মাথায় দিয়া ভাল হইয়। বসিয়া বলিতে লাগিলেন :--

“দেখুন, আগেকার দিনেও এসব ব্যাপার হু"ত। বিবাহ-বিচ্ছেদ ব্যাপারটা যে একেবারেই নতুন তা নয়, তৰে এখন যত হচ্ছে তখন তত হ'ত না, খুৰ কমই হ'ত। আজকাল যত বিয়ে তত ছাড়াছাড়ি হবেই। মানুষ যা সত্য আর শিক্ষিত হয়ে উঠেচে তা দেখলে

তাক লেগে যায়!” ট্রেণ যতই দ্রুত চলিতে লাগিল তার অতি কর্কশ ঘড়, ঘড়, শব

ততই বেশী হইতে লাগিল। কাজেই তখন যে কি কথা হুইল তা! আমার পক্ষে শোন! খুব শক্ত হুইয়৷ পড়িল? আমি)তাদের একটু কাছে গিয়া বসিলাম। জানার কারে জিজলোকি তত রই কখনও বা খবরের কাগজ পড়িতেছিলেন, তারও এই কথাগুলি গুনিবার খুব ইচ্ছা হইতেছিল। তিনিও শুনিতে চেষ্টা করিলেন বটে, কিন্ত তিনি যেখানে ছিলেন সেইখানেই রহিয়! গেলেন, সেখান হইতে একটুও নড়িলেন ন|।

স্থরেক্র আগুন

আমি এখন বেশ শুনিতে পাইলাম। বুদ্ধ ব্যবসায়ী আধুনিক শিক্ষা এবং সভ্যতার প্রতি একটু কটাক্ষপাত করিয়া কথ! কহিয়াছেন বলিয়া মহিলাটি একটু কাষ্ঠ হাসি হাসিয়া তাকে জিজ্ঞাস! করিলেন, “শিক্ষা! দোষের হ'ল কিসে? আগেকার মত বিয়ে করা যে তাল একথা! কিছুতেই বল! যায় না। বর এবং ক'নে কেউ কাউকে এখনকার মত এত দেখে শুনে নিত না। বিয়ের আগে তার! বুঝতেই পার্ত না ষে, তাদের ছুজনের মধ্যে প্রক্কত ভালবাস। আছে কিনা কিংব! বিয়ের পরেও তাদের ভালবাসা হবে কিনা। কে কাকে বিয়ে করলে এই স্তারা জান্তে পারত না। এরই ফলে তাদের জীবনটা চিরকালের জন্য ছুঃখময় হয়ে থাকত। এইটেই বুঝি অষ্পনাদের মতে খুব ভাল ?”

ব্যবসাদার ভদ্রলোকটি আবার সেই ক্ব্থাই বলিলেন, প্না তা! কেন? তখন সকলেই অসভ্য ছিল কি ন্ট! এখনকার দিনে মানব সত্যতা শিক্ষার আলে! পেয়েছে ।”

কিন্তু মহিলা যে প্রশ্ন করিয়াছেন তার উদ্ভীতিনি দিলেন না।

এই কথ! শুনিয়াই ব্যারিষ্টার তাকে ভিক্ঞ। করিলেন, “ন্থামী-্রীর অন্তরের অনৈক্যের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কটা! ফি, তা ভাল ক'রে বুঝিয়ে দিলে খুবই খুসী হব ।”

বৃদ্ধ বণিকের কিছু বলিবার পূর্বেই মহিলা বলিয়া উঠিলেন, “মা মশায়, সেদিন আর নেই।”

ব্যারিষ্ঠার তাঁকে বাধ! দিয়া বলিলেন, “গ'কেই বল্তে দিন না। ও*র নিজের মতটা উনিই ভাল ক'রে আমাদের বুঝিয়ে দিন, দেখা যাক.।”

ব্যবসায়ী বলিলেন, “শিক্ষা থেকে নানা রকম ভ্রম জন্মায় ।”

আমরা তখন সকলেই খুব উৎসাহের সহিত শুনিতেছি। আমাদের

নুরের আগুন ১৪

দিকে ফিরিয়া চাহিয়। মহিলাটি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, "পরস্পরের মধ্যে যাদের ভালবাস! জন্মায়নি এমন পুরুষ নারীর বিয়ে দেওয়! হয়। তারপর যখন এই সব ্ামী-স্ত্রী একত্রে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারে না যখন তাদের জীবন চিরকালের জন্য ছুঃখে ভরে ওঠে। তখন সকলেই বিশ্থিত হয়, সকলেই নিন্দা করে। এই রকম ব্যাপারই চলে আস্চে! মান্থষের জীবন নিয়ে, সুখ-শান্তি নিয়ে রকম খেল! করা আর চলবে না গরু চলে রাখালের ইচ্ছা মতন, রাখালকে সে মান্তে বাধ্য, কারণ তার নিজের হিতাহিত জ্ঞান নাই। কিন্ত মানুষের সঙ্গে জানোয়ারের মত ব্যবহার করা আর চল্বে নার্ক কারণ প্রত্যেক মানুষেরই হিতাহিত জ্ঞান আছে, তার নিজেরও ইচ্ছা বলে দ্বিনিষটা আছে, আশা ভালবাসা আছে সেটা তার নিজের অন্তরের জিনিষ। এখানে অন্তের শাসন টিকবে কেন

ব্যবসায়ী বলিলেন, “বাপ-মা বা অন্ত অভিভাবক ছেলে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে পশুর মত ব্যবহার করে-_একথা বল! নিতান্তই অসঙ্গত। কারণ পশুর জন্ত কোন আইন, বিধান ব! শৃঙ্খলা তৈরি হয় না, মানুষের জন্যই হয়েচে |”

মহিলা অমনি বলিলেন, “বেশ ত, আপনি বুঝিয়ে দিন যে, পুরুষ এবং স্ত্রীর মধ্যে বদি ভালবাস! না থাকে, যে মনের টানে মান্ষের প্রকৃত মিলন হয় তা যদি না-ই থাকে; তা হলে তারা একসঙ্গে কি ক'রে থাকবে ?”

খুব দুঢ এবং গম্ভীরগ্বরে বৃদ্ধ বণিক বলিলেন, “পুর্বে এদিকে মান্ষের নজর ছিল না। আজকালই এই কথাটা উঠচে। এখন এইটেও একটা সমন্তা হয়ে দাড়িয়েচে। ব্যাপারট! এখন দাড়িয়েছে এই -যে মুহূর্তেই অতি সামান্ত একটু অস্থবিধ! হয় সেই মুহূর্তেই স্ত্রী

১১ সবরের আগুন

স্বামীকে বলে থাকে--তোমার মত স্বামীর সঙ্গে আমি আর থাকৃব না।» শিক্ষিত সত্যদের কথাই নেই, এমন কি সরল কৃষকদের মধ্যেও এই সভ্যতার আলোক প্রবেশ করেচে। একটু সামান্ গোলযোগ, অতি তুচ্ছ একটু অসুবিধে হলেই আজকাল পাড়ার্গায়ের একজন কলুষকের স্ত্রীও ব'লে ওঠে_-এই নাও তোমার জিনিষ-পন্তর, আর রইল তোমার এই ঘর-দোর। তোমার সঙ্গে আমি আর থাক্‌ব না, আমার পোষাবে না; আমি চন্লুম জ্যাকের সঙ্গে জ্যাক তোমার চেয়ে দেখতেও ঢের ভাল”। এর চেয়ে আর অদ্ভুত ব্যাপার কি হ'তে পারে ? সঙ্কোচ এবং তয় থাকাটাই স্ত্রীলোকের সব চেয়ে বেশী দরকার”

এদিকে বৃদ্ধের পাশে যে যুবক কেরাণীটি বসিয়াছিল সে একবার মহিলাটির মুখের দিকে, ব্যারিষ্টার আমার দিক্ষেও একবার চাহিল।

বৃদ্ধের যুক্তি কে কি রকমভাৰে গ্রহণ করে তাই দেখিয়! সে হয় বৃদ্ধকেই সমর্থন করিবে, না হয় তার কথা হাপিয়াই উড়াইর। দিবে, ইহাই ছিল তার অভিপ্রায়

মহিলা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিসের ভয় ?” .

ব্যবসায়ী উত্তর দিলেন, "স্বামীর কাছে ভয়। স্বামীকে স্ত্রী নিশ্চয়ই তয় করবে ।”

অত্যন্ত বিরক্তির স্থুরে মহিলা বলিলেন, “সেদিন চলে গেছে মশায় ।”

"না, সেদিন যায়নি, যেতেও পারে না। প্রথম নারীর উৎপত্তি হয়েছিল পুরুষ থেকে! এই আদি নারীর মতই স্ত্রীলোককে অনন্ত কাল পর্য্যন্ত থাকতে হবে ।”

ইছা!। বলিয়াই, নিজেকে এই তর্কযুদ্ধে বিজয়ী বীর মনে করিয়া! বৃদ্ধ বশিক এমনভাবে মাথা নাড়াইতে লাগিলেন যে কেরাণীটি তত্ক্ষণাৎ

স্থরের আগুন ১২"

স্থির করিয়া ফেলিল এবং কোন কথ! না কহিয়াও শুধু এই হাসি দিয়াই বৃদ্ধের কথায় সায় দিয়া গেল।

মহিল বলিলেন, “পুরুষেরা এই রকমই ব'লে থাকে স্ত্রীলোকের বেলায় তাদের যুক্তিই এই। আপনার! নিজে স্বাধীন থাকবেন আর মেয়েদের খীচায় আটকে রাখবেন। নিজেদের সব রকমের ম্বাধীনত! দিতে আপনারা কোথাও কোন ক্রটি রাখেন নি।”

ব্যবসায়ী বলিলেন, “আমাদের কেউ হুকুম দেবার নেই। যদি কোন পুরুষ বাড়ীর বাইরে কোনখানে কোন কুকাজও করে তাতে তার নিজের ঘরে সন্তান-সৃষ্টি হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে নারী একেবারেই নিঃসহায়। নেহাৎ ক্ষণতঙ্গুর কাচের পাত্রটিরই মত তার অবস্থা |”

এমন গল্ভীরভাবে এবং জোরের সহিত তিনি এই কথা কয়েকটি বলিলেন যে, সেখানে ধারা শ্রোতা ছিলেন তার! সকলেই চুপ করিলেন, যেন সকলেই তার কথা মানিয়া লইলেন। এমন কি মহিলাও বুঝিতে পারিলেন যে তার হার হইয়াছে, কিন্তু তিনি হার স্বীকার করিতে রাজী হইলেন না। কাজেই একটু পরেই তিনি বলিলেন, '্যা। তা হলেও এটা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে, পুরুষের়ও যেমন সুখ ছুঃখের অনুভূতি আছে, নারীরও তেমনি আছে, পুরুষেরও যেমন ইচ্ছা ব1 প্রবৃত্তি বলে জিনিষটা আছে নারীরও তেমনি আছে। তাই যদি হয়, তা হলে বলুন দেখি স্ত্রী যদি স্বামীকে ভাল না বাসে তবে সেকি করবে?”

একটু ক্রোধের শ্বরে ব্যবসায়ী বলিলেন, "স্ত্রী যদি ম্বামীকে ভাল ন! বাসে? এতে কোনই আশঙ্কার কারণ নেই। স্বামীকে ভালবাসতে সে শিখুবে।”

১৩ সুরের আগুন

এই রকম অপ্রত্যাশিত যুক্তি যুবকটির বেশ মনের মত হইল,তাই সে কি রকম একট! অস্পষ্ট শব্ধ করিয়! ব্যবসায়ীর এই কথাই সমর্থন করিল।

মহিলা বলিলেন, “ভালবাসতে যদি সে না শেখে ? সে কিছুতেই তাকে ভালবাস্বে না, কারণ যেখানে মনের টান নেই ভালবাসার অতাব সেখানে হবেই। জোর ক'রে আর ভালবাসা জমানে। যায় না।”

ব্যারিষ্টার তদ্রলোকটি এই সময়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, “যদি কোন স্ত্রী ব্যতিচারিণী হয় তা হলে তার ত্বামী কি করবে ?”

ব্যবসায়ী বলিলেন, “এ রকম অবস্থায় স্বামীয় কিছুই মনে ন! করা উচিত। তার তখন একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রী বাতে আর কুপথে না যায় তাই করা।”

ব্যারিষ্টার আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “বন্ধ করবার উপায় সত্বেও যদি স্ত্রী কুপথে যায় তা হ'লে ?”

ব্যবসায়ী বলিলেন, "স্বামী আন্তরিক চেষ্টা করলেও স্ত্রী রকম কোথায় হয় আমি জানিনে।”

সকলেই তখন চুপ। কেরাণীটি তার জারগ্ঝা ছাড়িয়া খানিকট! কাছে আমিয়! একটু হাপিয়! বলিল, “হ্যা, হ্যা, এইত আমাদের দেশেই একটা ঘটনা হয়েছিল। সে এক কেলেঙ্কারীর ব্যাপার! সে ছিল এক অদ্ভুত মেয়ে মানুষ ; তার চরিত্রটা একেবারেই ভাল ছিল না। খুব সুন্দর সুন্দর কাঁপড় চোপড় পরে সেজে বেরুত। তার স্বামী যেমনি খুব ভাল মান্থষ ছিল, তেমনি ছিল খুব বুদ্ধিমান আর রসিক | সত্রীটি এক দোকানের একটা] ছোকড়ার সঙ্গে খুব হাসি ঠাট্টা ফকুরী চালাত। স্বামী বেচারা কয়েক দিনেই বুঝতে পারলে যে ব্যাপার ভারি গুরুতর। .সে তখন স্ত্রীর এইরকম ব্যবহার বন্ধ করবার চেষ্টা

সুরের আগুন ১৪

করলে, স্ত্রীকে কত উপদেশ দিতে লাগল, কত রকম ক'রে তার মন ভুগিয়ে চল্‌তে লাগল। স্ত্রী তার কোন কথায়ই কাণ দিলে না, তার য1 খুসী তাই করতে লাগল তারপর সে তার স্বামীর টাকা পয়সা পর্য্যগ্ত গোপনে গোপনে সরাতে লাগল ! ম্বামী বেচারা আর ধৈর্য্য রক্ষা করতে পারলে না, একদিন স্ত্রীকে ধরে খুব ক'সে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলে। তার ফলে হ'ল এই যে, ভাল হওয়াত দূরের কথ স্্রাটি দিন দিনই আরও খারাপ হ'তে লাগল, শেষে একদিন একটা ইছুদীর সঙ্গে বেরিয়ে পালিয়ে গেল। তার স্বামীর অবস্থায় কি আর করবার ছিল? স্ত্রীকে একেবারে ত্যাগ করলে, কিন্তু আর বিনে” করলে না! এখনও তার সেই কুমারের জীবনই চলেচে ) আর তার স্ত্রী এখন অধঃপতনের একেবারে শেষ সীমানায় গিয়ে পৌছেচে। এই হয়েছে ব্যাপার ।”

আগুনের মত একেবারে দপ. করিয়! জলিয়া উঠিয়া ব্যবসায়ী বলিলেন, “এই শ্বামীটি ভয়ানক বোৌকা1। সে যদি প্রথম থেকেই তার স্ত্রীকে সছুপদেশ দিত, শিক্ষা দিত, ভাল করবার চেষ্টা করত) মনের মত করবার জগ্ঠ গোড়া থেকেই লেগে থাকৃত, তা হ'লে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে যেতে পার্ত না, আজ তার সঙ্গে সুখে আনন্দেই সে থাকৃত। প্রথম থেকেই সাবধান হু'তে হয়, বুঝে স্ুঝে চল্‌তে হয়। সমস্ত মন- প্রাণ দিয়ে ভাল করবার চেষ্টা করলে কি সুফল ফলে না?

এই সময়ে পরের ষ্টেশনের যাত্রীদের টিকিট চাহিবার জন্ত গার্ড আসিয়া আমাদের গাড়ীতে ঢুকিলেন। ব্যবসায়ী তার টিকিটথানি দিলেন। গোলমাল থামিয়। গেল! তিনি আবার বলিতে লাগিলেন, "যা, মেয়েমান্থষদের যথাসময়েই সৎশিক্ষা। দিতে হয়), নইলে সবত নষ্ট হবেই। গোড়া কেটে ডগে জল ঢেলে আর কি হবে ?”

১৫ সুরের আগুন

আমি এতক্ষণ চুপ করিয়া কেবল শুনিতেছিলাম, কিন্ত আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না, বলিলাম, “দেখুন, এই যে একটু আগেই আপনি বল্ছিলেন পুরুষর1 সেই মেলায় গিয়ে যে সব কাণ্ড করেছিলেন তা লোকের সামনে বল্তেও লজ্জায় মাথা নুয়ে পড়ে, তার সঙ্গে আপনার একথার সামপ্রন্ত কোথায় ?”

তিনি জবাব দিলেন, “ও সেই কথা! দেত একেবারেই আলাদ। ব্যাপার ।”

তিনি আর কিছু বলিলেন ন]।

তারপরেই রেলের বাশী বাজিয়! উঠিল। তিনি উঠিলেন ? বেঞ্টার নীচে থেকে একটা ব্যাগ টানিয়া বাহির করিয়া গরম জামাটা ভাল করিয়। আঁটিয়া গায়ে দিয়া প্ল্যাটফরমে নামিয়! পড়িলেন।

তিনি নামিয়! গেলেন, আর সকলেই তখন কথা কহিতে আরম্ত করিল।

কেরাণীটি বলিল, “এই বুড়োও দেখচি সেই প্রাচীনকালের লোক- দের মত খুব কড়! শাসনের পক্ষপাতী |”

মহিলা বলিলেন, “সমাজের অত্যাচারের একটি জীবন্ত প্রতিমৃত্তি। নারী বিবাহ সম্বন্ধে কি জঘন্য ধারণ! 1”

ব্যারিষ্টার মহাশয় তার অভিমত জানাইলেন,_*বিবাহ সম্বন্ধে পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশী শিক্ষিত মাঞ্জিত ইউরোপের য| ধারণ! তা আমাদের দেশের লোকের এখনও হয়নি ।” :

মহিল! বলিলেন, “যেখানে ভালবাসা নেই, সেখানে মিলন নেই।

সুরের আগুন ১৬

যেখানে পুরুষ নারীর মধ্যে মনের টান নেইঃ সেখানে বিয়ে বিয়েই নয়। কারণ প্রক্কত ভালবাস! দ্বারা-_প্রেমের দ্বারাই বিবাহ বন্ধন পবিভ্র হয়। এই সোজ1 কথাও এই লোকগুলো! কিছুতেই বুঝবে না এইটিই সব চাইতে আশ্চর্য্য |”

বিবাহ লইয়া আবার কখনে। কারও সঙ্গে আলোচনা করিতে হইলে, যাতে এই সব যুক্তি সে প্রয়োগ করিতে পারে, এই উদ্দেস্তে কেরাণীটা এই কথাগুলি তারি মন দিয়] শুনিতেছিল, আর বেশ করিয়া মনে রাখিবারও চেষ্টা করিতেছিল। কিন্তু মহিল! যখন কথা কহিতে- ছিলেন সেই সময় আমাদের পাশে এক শব্ধ শুনিতে পাইলাম__চাপি হাসি কিংবা চাপা কান্লারই মত। পাশের দিকে ফিরিয়! চাহিয়! দেখিলাম--যে বুড়া! ভদ্রলোকটি এক পাশে কারও সঙ্গে কথ! ন! কহিয়া, গম্ভীর ভাবে মাঝে মাঝে বই বা! খবরের কাগজ পড়িতেছিলেন, তিনি একেবারে আমাদের কাছে আসিয়াছেন। এই আলোচনাটা শুনিবার জন্য তার অত্যন্ত কৌতুহল হইয়াছিল বলিয়া তিনি আমাদের একেবারে কাছে আসিয়! পড়িয়াছিলেন, আমাদের ত৷ খেয়াল ছিল না। বৃদ্ধের মুখ চোখ লাল হইয়। উঠিয়াছে, অন্তরে একটা ভীষণ যন্ত্রণা ক্রমাগত হইতে থাঁকিলে মুখের চেহারাটা যে রকম হয় তার মুখখান। তখন তেমনি একট বিকৃততাব ধারণ করিয়াছিল। তার ভিতরে একটা বেদনাভর! চাঞ্চল্য অনুভব করিলাম। কাজেই আমাদের বুঝিতে বাকী রহিল না যে, আমর! যে শব্ট! শুনিয়াছিলাম তা তারই চাপা! কারার শব তীর অন্তরে এমন একটা তীব্র বেদনার আঘাত লাগিয়াছে যে, তিনি আর নিজেকে সাম্লাইতে পারেন নাই, চাপিতে গিয়াও কান্না চাপিতে পারেন নাই। তিনি তখন কাপিতেছিলেন। আমরা সকলেই চুপ করিলাম |

১৭ সুরের আগুন

বৃদ্ধ তদ্রলোকটি অতি কষ্টে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি রকম ভালবাসার কথ! আপনি বলছিলেন ? কোন ভালবাসায় বিবাহ পবিজ্র হয় ?”

তার অবস্থা দেখিয়া মহিলার মন করুণা! সমবেদনায় পূর্ণ হুইয়। উঠিল, তাই তিনি অত্যন্ত নত্রভাবে বলিলেন, সত্যিকার ভালবাসা | যদি পুরুষ নারীর মধ্যে প্রক্কৃত ভালবাস থাকে তবেই বিবাহ সগ্ভব, নইলে নয়।”

বৃদ্ধের উজ্জল চোখ তখনও ছল্‌ ছল্‌ করিতেছিল। তবুও একটু ইসিতে চেষ্টা করিয়া তিনি আবার ভিজ্ঞাসা করিলেন “বেশ কথা! কিন্ত এই সত্যিকার ভালবাস দ্বারা আমরা কি বুঝি ?”

মহিল। উত্তর দিলেন, “ভালবাসা যে কি, তা! প্রত্যেকেই নিশ্চয় £বাঝে, একি বুঝিয়ে দেবার জিনিব ?”

বৃদ্ধ বলিলেন “আমি ঠিক বুঝতে পারিনে, আগনি আমায় বুঝিয়ে দিন ।”

মহিলা বলিলেন, “এ-ত খুব সোজা কথ] 1”

সোজা হুইলেও তাঁকে খানিকক্ষণ চুপ করিয়া ভাবিতে হইল, তারপর তিনি বলিলেন, “সকলের চেয়ে একজনকে বেশী পছন্দ করাই হ'ল এই ভালবাস! ।”

বৃদ্ধ এবার হাসিলেন, বলিলেন, “আচ্ছা, এই যে একজনকে বেশী পছন্দ করা--এট। ক'দিনের জন্ত ? একি এক মাস, না এক সপ্তাহ, না একদিন; না! এক ঘণ্টার জন্ত ?”

মহিলা বলিলেন, “পরিষ্কার বুঝতে পার! যাচ্ছে আপনি আর কোন বিষয় বল্চেল।”

“না, না, আপনিও যা বল্চেন, আমিও ঠিক তা-ই বল্চি।”

হ্বরের আগুন ১৮

এই সময় ব্যারিষ্টার তাকে বলিতে লাগিলেন, “মহিলা! কি বল্‌্চেন তা আমিস্প্ট করে আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ইনি বল্‌্তে চান যে প্রথমতঃ পুরুষ নারী উভয়ের মধ্যেই ভালবাস! থাকা চাই, ষদি প্রাণের টান থাকে তবেই বিবাহ পবিত্র হয়, নইলে তয় ন1) দ্বিতীয়তঃ যে বিবাহে ভালবাসা নেই, প্রাণের টান নেই, সেই বিবাহে নৈতিক রন্ধনও কিছুই নেই।”

তারপর মহিলার দিকে ফিরিয়। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার কথা ঠিক বল] হয়েচে ?”

কোনও কথ! না কহিয়া শুধু ঘাড় নাড়িয়াই মহিলা তাঁকে জানাই-- লেন যে ঠিকই বলা হইয়াছে

“তার পর কথ! এই যে,_”এই পর্য্যস্ত বলিতে না বলিতেই ব্যারিষ্টারকে থান়্িতে হইল। কারণ সেই বৃদ্ধ আর ধৈর্ধ্য ধারণ করিতে পারিলেন না, অলস্ত অঙ্গারের মত ছুইটি লাল চোখে. তার দিকে চাহিয়া তার কথায় বাধ! দিয়া বলিলেন, “বুঝতে পেরেচি, আর বল্‌্তে হবে না। আপনারা যা বলচেন আমিও ঠিক তাই বল্ছি। কিন্ত আমি জান্তে চাইচি, এই যে পুর্ববান্তরাগ-_এটা ক'দিনের জন্তে ?”

অত্যন্ত বিরক্তির সহিত মহিলা জবাব দিলেন, “বু দ্বিনের জন্তে, কখনো কখনো সারা জীবনের জন্তে 1”

“শুধু নাটক আর নভেলে এই অনুরাগ সারা জীবনের জন্য, কিন্ত বাস্তব জীবনে কথ্থনো তা দেখা যায় না। যা! হয়ে থাকে তাতে এটা স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যায় যে, এই অনুরাগ সারাজীবন দুরের কথা, বহুদিনও প্রায়ই থাকে না। সচরাচর যা! দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্টই বুঝতে পার৷ যাচ্ছে, এই অন্ুরাগের আয়ু ছু'চার মাস, ছু চা'র সপ্তাহ ব1। ছু'চার দিন, আবার কখনো! কখনো বা ছু'চার ঘণ্টা মাত্র

১৯ অসুরের আগুন

তা নইলে, আজকাল এই পূর্ববান্থরাগ যতই বেড়ে যাচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ ততই বেশী হচ্ছে। বল্‌তে গেলে যত বিয়ে, প্রায় ততই ছাড়াছাড়ি

বৃদ্ধের গ্রই মন্তব্য শুনিয়া আমরা তিন জনেই সমস্বরে বলিয়া! উঠিলাম, “সে কি মশায়? আপনি কি ক'রে এমন কথা বল্‌্চেন ? না না, হতেই পারে না। আসল কথা হচ্ছে এই--+9 এমন কি কেরাণীটিও বৃদ্ধের একথা মানিল না, সেও বিরক্তির ভাবই প্রকাশ করিল।

কিন্তু বুড়া আমাদের আর বলিতে ন! দিয়া নিজেই বলিলেন, "আপনারা একটা ভূল কচ্ছেন। আপনারা শুধু একটা অন্থমান--শুধু একটা কল্পন1 নিয়েই সব বলচেন, আর আমি বল্চি বাস্তব নিয়ে, অর্থাৎ যা আমাদের সমাজে হচ্ছে এবং হয়ে থাকে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, প্রত্যেক সুন্দরী যুবতীর প্রতিই প্রত্যেক পুক্রষ একটু ভালবাসা অন্ুতব করে।”

মহিল! বলিলেন? “কি ভয়ানক কথা | আমর!'ঘে ভালবাসার কথ! বল্চি তা ছু* এক মাস, ছু*এক বছরের নয়, সারা জীবনের |”

“নিশ্চয়ই নয়। আচ্ছা যদি ধরেই নেয়া যায় যে, এক জন পুরুষ একজন নারীকে সব চেয়ে বেশী পছন্দ করে, আর সারা জীবনই তার এই অনুরাগ রয়েচে | সে ক্ষেত্রে এটাও খুব বেশী সম্ভব যে, সেই নারী পুরুষটিকে ভালবাসে না, হয়ত অন্ত একজন পুরুষের দিকে তার টান বেশী। সার! ছুনিয়ায় এই রকম ব্যাপারই চলেচে এবং চলবেও ।”

এই বলিয়াই বৃদ্ধ একটি চুরুট বাহির করিয়া! ধরাইয়! খুব জোরে টানিতে লাগিলেন ব্যারিষ্টার বলিলেন “ভালবাসা উভয় পক্ষেরই সমান হ'তে পারে ।”

“আজ্ঞে নাঃ হ'তে পারে না। যা সাধারণত অসস্তব, তা আমরা

স্থুরের আগুন ২০

মোটেই হিসেবের ভেতর নেই নে। একটা কথ হচ্ছে-_পরিতৃপ্তি। একট জিনিষে তৃপ্তি লাভ করলে, তার দিকে টান কষে। আপনি চিরকাল একজনকে সমান ভালবাসতে পারেন,--একথা' বলতে যা, আর একটা বাতি সারাজীবনই জলবে- একথা বলাও তা।”

বলিয়াই অসাধারণ উদ্যমে তিনি চুরুট টানিতে লাগিলেন।

মহিলা বলিলেন, আপনি অন্ত রকমের ভালবাসার কথা বল্‌্চেন। জীবনের একই আদর্শ, একই নীতি এবং একই রকমের ধর্প্রবণতায় যে ভালবাস! জন্মায়, তা কি আপনি অন্বীকার করেন ?”

দ্ধর্মভাব এবং জীবস্তের আদর্শের সমতা ! তাই যদি হয়, তা হ'লেও একই শয্যায় একত্রে শয়ন কর্বার কোন কারণ থাকে না। 'আমার এই অশিষ্ট বাক্যের জন্ত আমাকে ক্ষমা করিবেন আশা! করি। আদর্শ এক বলেই একত্রে শয়নের ধারণা এবং ইচ্ছা লোকের মনে জন্মেচে 1” বলিয়াই তিনি একগাল হাসিলেন।

ব্যারিষ্টার বলিলেন, পপ্রক্ৃত ব্যাপার কিন্ত আপনি যা বল্‌চেন ঠিক তার উন্টোৌ। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিবাহ অনন্তকাল ধরেই চলে আসচে, যতদিন এই ছুনিয়ায় মানুষ থাকবে ততদিন চল্বেও। পৃথিবীর সকল লোকেই অন্ততঃ বেশীর ভাগ লোকেই বিয়ে করে এবং অনেক লোক তাদের সুদীর্ঘ বিবাহিত জীবন খুব ভাল ভাবেই কাটায় ।”

শুর্ুকেশ বৃদ্ধ আবার একটু হাসিলেন, বলিলেন, “আপনারা বল্চেন যে ভালবাসার ওপরেই বিবাহ প্রতিষ্ঠিত কিন্তু যখনই আমি বল্‌তে চাই যে, বিবাহের যুলে সাধারণ ভালবাসার স্থানে আছে লালসা, এমনি আপনার! প্রমাণ করতে আরম্ভ করলেন যে, ভালবাসা আছে যেহেতু বিবাহ আছে। আজকালকার বিয়ে স্তধু একটা প্রতারণ। ছাঁড়। আর কিছুই নয়।” -

২১ সুরের আগুন

ব্যারিষ্টার বলিলেন, গ"আমি যা কিছু বল্‌তে চাই তা হচ্ছে এই, বিবাহ আগেও ছিল, এখনও আছে এবং চিরকালই থাক্‌বে ।”

"্ট্যা, বিবাহ ছিল--আছে-_থাকবেও বটে। বিবাহ ছিল এবং আছে শুধু সেই সব জাতের মধ্যে যার! বিবাহটাকে শুধু একটা আইনের চুক্তি মনে করে না, যারা বিবাহকে মনে করে ধর্ম্মেরই একটা শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান, বিবাহের অনুষ্ঠানে যারা ভগবানেরই উপস্থিতি উপলব্ধি করে, এবং তগবানকেই সাক্ষী রেখে বিবাহ ক'রে, যারা ছাড়াছাড়িকে মহা। পাপ বলে মনে করে, বিবাহ বন্ধনকে যার! চিরকালের জন্য, অন্ত কালের জন্য, জন্ম জন্মাস্তর ধ'রে পবিত্র মনে করে। এই সব জাতের মধ্যে প্রক্কত বিবাহ আছে, আমাদের দ্বেশে নেই আমাদের দেশে বিবাহ শুধু একটা! চুক্তি মাত্র, এর লঙ্গে ধর্মের লেশমাত্র ঝেই, বিবাহের ভেতরে ভগবানের অস্তিত্ব আমরা প্রাণে প্রাণে অন্থতব কর্ি।না। কাজেই এই ধর্মশূন্ত বিবাহের শেষ পরিণাম হচ্ছে প্রতারণা, বড়া, মারামারি আর ছাড়াছাড়ি। অন্য কিছুর চেয়ে শুধু প্রতারণা, হ”লেও বরং খানিক সহ্থ করা যায়। স্বামী প্রতারিত করে স্ত্রীকে, স্ত্রী প্রতারিত করে ম্বামীকে। স্ত্রী মনে করে তার বিবহিত জীবন খুব তালই চল্‌চে, সে তখনও হয়ত স্বামীর প্রতারণা বুঝতে পারে নি, আবার স্বামীও মনে ভেবে নিলে তার দাম্পত্য জীবন বেশ কাট্চে, স্ত্রীর প্রতারণা সে ধরতে পারে নি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বামী অন্ত কোন পল্লীর স্ত্রীলোককে দেখ.চেন, আর স্ত্রীও অন্য কোন পুরুষকে স্বামী বলে মনে কচ্ছেন। এটা কি নিতাস্তই থারাপ নয়, অসহ্ নয়? স্বামী এবং স্ত্রীর একজ্রে চিরকাল বাস করবার একট বাধ্যবাধকতা আছে এজন্য তারা প্রতিশ্রতও থাকে কিন্ত তগবানকে সাক্ষী ক'রে প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়েও, বিবাহের পর ছু'চার মীসের মধ্যেই দেখা যায় স্বামী স্ত্রীকে ত্বণা কচ্ছে, স্ত্রীও স্বামীকে দ্বণ

সুরের আগুন

কচ্ছে, এবং যদিও তার! ভেতরে ভেতরে ছাড়াছাড়ির জন্য ছট্‌ ফট কচ্ছে__তবুও তার! একত্রেই ঘর কন্নাও কচ্ছে। শেষে তাদের জীবন নরকের মত বীভৎস হয়ে ওঠে। এরই ফলে কেউব! বিষ খেয়ে মরে কেউবা খুনে! খুনি ক'রে মরে, কেউবা জলে ঝাঁপ দেয়। মোটকথা পরিণাম অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে ওঠে ।”

তিনি পুর্ণ উদ্যমে একটুও না থামিয়া এমনভাবে বলিতে লাগিলেন যে, আমর! কিছুই বলিবার সুযোগ পাইলাম নাঁ। বলিতে বলিতে তিনি নিজেই খুব উত্তেজিত হুইয়া উঠিলেন, আমরা সকলেই চুপ, করিয়। রহিলাম, আমাদের যে কিরকম একটা অশাস্তি বোধ হইতেছিল। অশান্তি বিরক্তির নিস্তব্ধত! ভঙ্গ করিবার ইচ্ছায়ই ব্যারিষ্টার বলিলেন, “এটা ঠিক যে, বিবাহিত জীবনে কখনো! কখনো! এরকম বিপদ-আপদ ঘটে থাকে

এবার বৃদ্ধ খুব শান্ত ভাবে নরম সুরে বারিষ্টারের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “আপনি জানেন কি আমি কে 1”

ব্যারিষ্টার বলিলেন, “আজ্ঞে না, আপনাকে আমি চিনি না॥ চেনবার ইচ্ছাও আমার নেই ।”

“আপনার ইচ্ছা না থাকৃতে পারে, কিন্তু এটা জান্বেন যে, আপনার ইচ্ছাটাই একট! বড় জিনিষ নয়। কাজেই ইচ্ছা! আপনার থাক আর নাই থাক, আমি আমার পরিচয় দিচ্ছি। আমার নাম পজ্‌ নিশেফ। বিবাহিত জীবন যে বিশেষ মারাত্মক বিপদের কথা বল্লেন, আমি তার তুক্তভোগী। আমার সেই বিপদ যে-সে ব্যাপার নয়--হত্যা! আমিই আমার স্ত্রীকে খুন করে ফেলেছিলুম।

বলিয়াই তিনি একে একে আমাদের সকলের দিকেই তাকাইলেন।

হত স্থরের আগুন

আমরা শুনিয়াই একেবারে থ' হইয়। গিয়াছিলাম। আমাদের আর কথা কহিবার মত শক্তি যেন ছিল না, সকলেই একেবারে চুপ।

কিন্ত আমর! চুপ করিয়া থাকিলেও তিনি চুপ করিলেন না। বলিলেন, “যাই হোক্‌ আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই, আপনাদের এতকাছে থেকে আর বেশীক্ষণ জ!লাতন কর্ব ন1”

ব্যারিষ্টার বলিলেন, “না, না, আমরা! মোটেই কোন অসুবিধে বোধ কচ্ছি নে; অমন কথ! বল্বেন না।”

পজ.নিশেফ, তাঁর কথায় মন না দিয়া ফিগিয়া নিজের জায়গায় গিয়া বসিয়! পড়িলেন।

আমরা তখনও চুপ করিয়াই ছিলাম কেবল ব্যারিষ্টার এবং সেই মহিলা চুপি চুপি কথা কহিতে লাগিলেন।

৯১০]

এই বৃদ্ধ পজ.নিশেফ, যে বেঞ্চিতে বসিয়াছ্িলেন তার সামনের বেঞ্চিতে একটু দূরে আমি চুপ করিয়া বসিয়াছিলাম। আমার বলিবার কিছুই ছিল না, আর একটু অন্ধকার হইয়াছিল বলিয়৷ কিছু পড়িবারও সুবিধা ছিল না। কাজেই আমি লম্বা হইয়! শুইয়া চোখ বুজিয়া রহিলাম ; চোখে আমার ঘুম ছিল না, তবুও ঘুমের ভাণ করিয়াই নিশ্চল হইয় পড়িয়! রহিলাম।

গাড়ী পরের ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিল। মহিলা এবং ব্যারিষ্টার ভদ্তরলোকটি প্লাটফরমে নামিয়৷ আর একটা গাড়ীতে উঠিলেন। কতক লোক নামিয়া যাওয়ায় একটু বেশী জায়গা খালি পাইয়া সেই কেরাণীটিও লম্বা! হইয়া শুইয়া পড়িল এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমে অজ্ঞান হইয়।

সবরের আগুন ২৪

গেল। এতক্ষণ ধরিয়! বুড়া ভদ্রলোকটি চূরুট টানিতে ছিলেন। আর পূর্ধ্বের ষ্টেশনে নামিয়া যে জল লইয়া আসিয়াছিলেন সেই-জলে চা তৈয়ারী করিয়া খাইতেছিলেন।

যেমন একটিবার চোখ খুলিয়াছি বৃদ্ধ অমনি আমার দিকে তাকা- ইলেন। তারপরে খুব গস্ভীর শ্বরে তিনি আমায় বলিলেন, “আমি কে এবং কি রকমের লোক তাত আপনি জান্তে পেরেচেন, কাজেই আমার কাছে বসাটাও আপনার খুবই খারাপ ব'লে মনে হচ্ছে, নয় ? যদি তাই মনে করেন আমি চলেই যাচ্ছি। আর এক গাড়ীতেই বরং যাব”

আমি অমনি বলিলাম, “না, না, কিছুই মনে করিনি। আপনি অমন কথাটি বল্বেন না।”

বোধ হয় বৃদ্ধ আমার উপরে একটু খুসী হইলেন, বলিলেন, “আপনাকে একটু চা দেব? খান না একটু বোধ হয় একটু কড়া হয়ে গেচে |”

তিনিত খানিকটা চ1 আমাকে টালিয্না দিলেন। কি কড়া চা! কড়া হইলেও না৷ খাইয়। পারিলাম না।

তিনি বলিলেন, “দেখুন ও'র1 1! বলেন সবই বাজে, সবই ভুয়ো ।”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “কিসের কথ! বলচেন ?”

“এই যে কথ! হচ্ছিল। বিয়ের কথা আর ভালবাসার কথা। আপনার কি ঘুম পাচ্ছে?”

যে চা খাইয়াছি তাতে, যদিও কখনে! একটু ঘুম হইত, সে আশাও আমার আর ছিল না। তাই আমি বলিলাম, “না, না, আমার ঘুম মোটেই পায়নি।

“আমি যে বীভৎস কাজ করেচি তার মুলেও ছিল প্র ওরা ষে

২৫ সুরের আগুন

"ভালবাসার কথ! বলছিলেন তাই। আপনি শুনতে চান আমি বলতে পারি।” '

আমি বলিলাম, “যদি বলৃতে আপনার কষ্ট না হয় আমি নিশ্চয়ই শুন্ব।”

“না! আমার কষ্ট হবে না, বরং কলে মনটা খোলসা না করলেই আমার কষ্ট হবে। শোনবার আগে আর একটু চা খেয়ে নিন। চাটা বড্ড কড়া হয়ে গেছে।”

কি সর্বনাশ ! চা আবার খাইতে হইবে | কিছু বলিলাম না। “মৌনং সম্মতি লক্ষণম্, মনে করিয়া বৃদ্ধ খানিকটা চা দিলেন। এবারে চা একেবারে ভীবণ রকমের কড়া হইয়া গিয়াছিল। তবুও খাইলাম, কিন্তচাখাইলাম কি মদ খাইলাম বুঝিতে পারিলাম না, এমনি তার রং

যেমনি বৃদ্ধ গল্পটি আরম্ভ করিবার উপক্রষ :কর্লেন অমনি এক রেল কর্মচারী আমাদের কামরায় ঢুকিলেন। বৃদ্ধ নিতান্ত বিরক্ত হইয়া খানিকক্ষণ মুখ তার করিয়া রহিলেন। কর্ধচীরীটি নামিয়া যাওয়ার পর তিনি বলিলেন, “এইবার আমি বল্ব।' আপনি কি সত্যি গুন্বেন ?”

আমি তাকে বলিলাম যে সত্যই গল্পটি শুনিবার ইচ্ছা আমার হুইয়াছে।

একটুকাল চুপ করিয়! থাকিয়া, ছুই হাত দিয়! কপাল এবং মুখখান! মুছিয়া তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন £--

“বিবাহের পূর্বে আমিও অন্ত দশ জনের মতই ছিলুম। সমাজে আমার খুব প্রতিপত্তি ছিল, থাকবারও কথা; কারণ আমি ছিলুম বড়লোক--জমিদার, তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও আমি সংশ্লিষ্ট ছিনুম। দেশের সন্তরান্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেও আমি একজন উচ্চপদস্থ

সুরের আগুন ২৬

লোক ছিলুম। বিবাহের আগে অবধি যে ভাবে জীবন কাটিয়ে এসেচি তাতে মনে হয়েছিল যে আমার বর্তব্যের পথে আমি ঠিকই চলেচি। নিজেকে আমি নৈতিক চরিক্রের আদর্শ ব'লেই মনে করতুম। আমার বয়সের এবং আমার সমান পদস্থ লোকদের মত কেবল আমোদ- প্রমোদই আমি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করিনি। আমি কখনো কোন স্ত্রীলোকের মনভুলাবার চেষ্টা করিনি, আমার নিতান্ত ত্বণিত প্রবৃস্তি ছিল না। তবে যেটুকু নৈতিক অপরাধ করতুম তাও খুব সামান্য, আর তা করুতূম ডাক্তারের পরামর্শে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য স্ত্রীলোকের সংসর্গ এড়িয়েই চল্তুম। আমার ধারণা ছিল এই যে, যদি তাদের ভালবাসায় জড়িয়ে পড়ি তা হলেই ফ্যাসাদ। ভালবাসার টান যে আমার অন্তরে ছিল না তা নয়, কিন্তু বাইরে দেখাতুম যেন আমার ওসব কিছুই নেই। আমি খুব গর্বব অনুভব করতুম, কারণ এইটিই আমি নৈতিক চরিত্রের আদর্শ ব'লে মনে স্থির ক'রে রেখেছিলুম !”

তিনি হঠাৎ থামিয়া গেলেন। খানিকক্ষণ কাসিয়া চুরুটটায় কয়েকটা টান দিয়া আবার বলিতে লাগিলেন, “এতেই আমার চরিত্র খারাপ হ'তে লাগ্ল। কথ হচ্ছে এই, যখন ভালবাস! বা৷ পরিচয় থুব বেশী হয়ে পড়ে তখনই সমস্ত নৈতিক বন্ধন থেকে যে নিজেদের আমরা মুক্ত করি এইটিই হ'ল ভূল। অন্যায় অসদাচরণের যে সঙ্কোচে বা বাধা থাকে, পরস্পরের ক্রমাগত মেলামেশায় তা শিথিল হ'য়ে পড়ে। শিথিল হতে দিয়েই আমর! ভুল করি আমিও এই বাধা বা সন্কোচ ক্রমাগত দুর করে দিচ্ছিলুম, আমি এইটিকেই একট! গুণ মনে করতুম। একবার এক যুবতী খুব সম্ভব আমাকে ভালবেসেছিল। 'আমি তাকে টাকা পাঠাতে পারিনি বলে আমার ভয়ানক ছুঃখ হয়েছিল তার সঙ্গে যেরকম ক'রে মিশেচি তা ষে ভাল তা৷ একেবারেই নয়।

২৭ সুরের আগুন

যতদিন টাকা পাঠাতে পারিনি ততদিন আমার মানসিক যন্ত্রণা একটুও কমেনি। টাকা পেয়ে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল যে, নৈতিক বন্ধনের কঠোরতা আমার আর কিছু মাত্র নেই।»

আমি সবার কথা শুনিতেছিলাম আর ঘাড় নাড়িয়! সায় দিতেছিলাম।

তিনি হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “না, না, ওরকম ঘাঁড় নেড়ে সায় দিয়ে আমাকে থুসী করবার কোনই দরকার নেই। শুধু একট! চালাকি, আমিও বেশ জানি। মাপ করবেন মশায়। কথ৷ হচ্ছে যে ব্যাপার বড়ই তয়ানক।”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি ব্যাপার ?”

“নারীর সঙ্গে পুরুষের যে সম্বন্ধ তা নিয়ে আমরা এমন একট] প্রতারণা কচ্ছি, এমন একটা ভুল ধারণ! নিগ্নে রয়েছি তা মারাত্মক হ্যা, আমার একটা মস্তদোষ এখন এই হয়েছে €ষ, ধীরে নুস্থে কোন কথ। বলতে পারিনে, আমি যেন উত্তেজিত হ'য়ে পড়ি। যে বিষম ঘটন। আমার জীবনে ঘটেচে সেজন্য যে এরকম হচ্ছে তা নয়, তবে সেই ঘটনা! হওয়ার পর থেকেই আমার সমস্ত মত একেবারে বদলে গেচে। আমি যেন এখন একেবারে আলাদা মাস্থষ। আমার চোখ খুলে গেচে। একবার বিষম ভুল ক'রে যথেষ্ট শিখেচি। আমার ভেতরটা বদূলে একেবারে উল্টো হ'য়ে গেছে--একেবারে উল্টো |”

তিনি একটি চুরুট ধরাইলেন। তখন অন্ধকার ছিল, কাজেই তীর মুখখানা আমি ভাল করিয়৷ দেখিতে পাইলাম না। কিন্তু দেখিতে না পাইলেও তাঁর গল। ঠিক শুনিতে পাইলাম ট্রেণের ঘড. ঘড়, শবও ছাপাইয়া তার কথা আমার কাণে আমিতেছিল।

তারপর তিনি বলিলেন, ঠেকে শিখেচি মশায় যন্ত্রণায় আমার হৃদয়ের তস্ত্রীগুলো৷ সব যেন মুচূড়ে ছিড়ে গিয়েছিল। ঘা খেয়ে ভেবেচিন্তে বুঝতে পেরেচি রোগের মূল কোথীয়। সেই সময় থেকেই জান্তে পেরেচি কি হওয়া উচিত, এবং য! হচ্ছে তার গলদ কি এবং কোথায়।

প্যাক, আমার জীবনে যে বিষম কাণ্ড ঘটেচে তা তার উৎপক্ভি কোথাথেকে কি করে হ'ল, তা এবার আপনাকে বনৃচি। আমার বয়েস ষোল বছরও পূর্ণ হতে না হতেই আমি কুপথে পা! দিয়েচি। তখনও আমি ছাত্র মাত্র, আমার দাদাও তখন বিশ্ববিষ্তালয়ের উচ্চশিক্ষার্থী। পূর্বে আমি কখনো কোন স্ত্রীলোকের খবর রাখিনি, কিন্তু তাই বলে যে নির্দোষ ছিলুম তা! নয়। আমার বন্ধুরা, সহচরেরাই আমার মন কলুষিত ক'রে দিয়েছিল। তার ফলে হ'ল এই যে, কোন এক বিশিষ্ট স্ত্রীলোকের বিষয় না হলেও স্ত্রীলোকের চিন্তায় আমার মনট| কিরকম ব্যাকুল হয়ে উঠত |

“যখন একলা থাক্তূম তখন কতরকমের কুৎসিৎ চিন্তা আমার মাথায় ঢুকৃত।. কাজেই শতকরা! নিরেনবব,ইজন যুবকেরই মত আমি মনে মনে একটা বিষম কষ্ট অনুভব করতুম। মন এক এক সময়ে থকে উঠত, ভয়ানক ভয় হ'ত, তগবানের কাছে এক একবার প্রার্থনাও করতুম! কিন্তু এতবড় প্রলোভন দমন করতে পারতুম নাঃ আবার সেই কুচিন্তা এসে মনট! ঢেকে ফেলুত। কাজেই চিন্তায়- আর কাউকে জড়িয়ে তখনও নষ্ট করিনি |

২৯ সুরের আগুন

"এই সময়ে আমার দাদার এক বন্ধু এল। ইনিও বিশ্ববিষ্ভালয়ের একজন ছাত্র। .লোকে তাকে খুব ভাল ছেলে বল্ত, প্ররুতপক্ষে তিনি ছিলেন অতি অপদার্থ, অতি জঘন্ত। বাইরে সে বেশ ভাল মতই থাকৃত, হাসিগল্প খুব করত, পাঁচজনের সঙ্গে বেশমিশ তেও পারত। দাদার বন্ধু, কাজেই সে আমারও বন্ধু। এই বদ্ধুবর আমাদের মদ খেতে শেখালে একদিন মদ খাওয়ার পর নিতান্ত এক কুৎসিত স্থানে যাওয়ার অন্য সে আমাদের ধরে বস্ল। সে কতরকম যুক্তি দিয়ে আমাদের বোঝাতে লাগ্ল। আমরা! তার সঙ্গে গেলুয। আমার ভাই, এর পূর্ব ঈপর্য্যস্ত অনেকটা নির্দোষ ছিল, তারও সেই দিনই পতন হ'ল। আর ষোল বছরের বালক আমিও সেই দিন থেকেই উৎলন্নের পথে ভয়ানক এগিয়ে যেতে লাগ্লুম তখন বুঝতেই পার্লুষ লা) কি ভীষণ অন্ঠায় কাজ কচ্ছি, কি ক'রে আর পরিণাম চিস্তা করব ?

প্যারা আয়ার বয়োজ্োষ্ঠ তার! কখনো! আধার বলে নি যে আমি অন্তায় কচ্ছি, যে পথে চলেচি সে হচ্ছে পাপের পঞ্চ প্রক্কত মৃত্যুর পথ এমন কি আজকালও বড়র! ছোটদের সাবধান খসে দেয় না। সত্যি বটে সহ্ুপদেশের বইও আছে, স্কুলে কলেজে তা পড়তেও হয়, কিন্তু সে” কেবল পরীক্ষায় কয়েকটি নম্বর পাওয়ার জন্ে ছেলেরা মুখস্থ ক'রে রাখে। প্রায়ই আবার মুখস্থ না করলেও চলে, কারণ বিদ্যালয়ে এসব পুস্তকের চেয়ে ব্যাকরণের স্ুক্র, ভূগোলের সংজ্ঞ৷ প্রভৃতির ওপরেই জোর দেয়৷ হয় বেশী। নীতিশিক্ষা ধর্শিক্ষাত বিদ্যালয়ে হয়ই না, চরিত্র গঠনও হয় না| যাই হোক্‌, ধাদের কথা বিশ্বাস করি, ধাদের শ্রদ্ধা করি তাঁর! কেউই আমায় বারণ করেন নি। বারণ করাও দুরের কথা তারা বরং বলেচেন আমি ঠিকই কচ্ছি।

“তা ছাড়া আমি যাদের ভাল বলে জানতুম তাদেরও রকম

সবরের আগুন

অন্যায় করতে দেখে ভাৰতুম, আমি যা অন্যায় বলে মনে কচ্ছি তা বোধহয় মোটেই অন্যায় নয়, তার পরিণাম নিশ্চয়ই খারাপ নয়, এতে ভয়ের কোন কারণ নেই ; আমারই বোধহয় ভূল, আর এই বৃথা সংশয় গতর্ণমেণ্টে বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করে, মোটা মাইনের সব ডাক্তার নিযুক্ত ক'রে বারবণিতাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা! করে। স্বাস্থ্যের পক্ষে কোনটা নিতান্ত দরকার তা৷ এই ভাক্তাররাই ঠিক ক'রে দেয়, এবং ডাক্তাররাই এই রকম চরিত্র সমর্থন করে। জন্তে বিজ্ঞানই দায়ী

আমি জিজ্ঞাস! করিলাম, “বিজ্ঞান দায়ী হবে কেন মশায় ?

“ডাক্তাররা বিজ্ঞানের এক একটা বড় পাণ্ডা। প্রথমে তারা অসৎপথে যেতে সাহায্য করে, তারপর যখন ব্যারাম হয়, তখন তারাই আসে চিকিৎসা করতে কি আশ্চর্য্য 1”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, প্ব্যারামের চিকিৎসা! করবে না কেন %

এক্ষেত্রে চিকিৎসা! করার অর্থ হচ্ছে গোড়া কেটে আগায় জলদেয়।। যে কারণে ব্যাধি জন্মায় সেটি বন্ধ করবার জন্য যদি তারা এতটুকুও চেষ্টা করত তা হ'লে যে আজ এসব ব্যারাম লোকের মোটেই হুত না। যেটা সর্ববনাশের মূল সেটা দূর না ক'রে তারা বজায়ই রাখে, মানুষকে কুপথে যেতে সাহায্যই করে। যাক, এসব নিয়ে আলোচনা করবার এখন আর আমার দরকার নেই। আমার নিজের যা হয়েছিল তা-ই আমি বলে যাই কিন্তু এটা! বেশ জান্বেন যে, আমার যা! হয়েছিল, তা অন্ততঃ প্রত্যেক দশজনের মধ্যে নয় জনের হয়ে থাকে আমার এই অধঃপতন ভালবাসায় হয় নি। প্রকৃত ভালবাসায় সর্বনাশ হয় ন|। কিছুতেই ভালবাস! নয়। আমার পতনের কারণ হ'ল এই যে আমি যে সংসর্গে থাক্তুম সেই সংসর্গই আমার কাজকে খুব স্বাভাবিক সরল এবং নির্দোষ বলে সমর্থন করেচে। দরকার এবং আমোদ মনে

৩১ সবরের আগুন

করে আমার তরুণ হৃদয় সেই কুপথেই চল্তে লাগ্ল। তা ছাড়া এটাও শোন্তে পেতুম যে আমার মত যুবকদের পক্ষে ঢুরুট খাওয়া, এমন কি মদ খাওয়াটাও বিশেষ দরকারই শুধু নয়, একটা বিশেষ কর্তব্যও বটে। একথ। ভাক্তাররা বেশ করে বুঝিয়ে দিয়েচে। চারদিকের সহায়তায় আমি খুব প্রবল বেগেই পাপের পথ এগিয়ে যেতে লাগ্লুম আমার স্পষ্ট মনে আছে যে প্রথমদিন পাপ করবার পর আমি ছুঃখে, মানসিক যন্ত্রণায় একেবার অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম

“তারপর থেকে আমার অন্তরের সরলতা! এবং পবিস্রিতা যা কিছু দুল সবই গেল, কাজেই আমি আর কোন ল্মারীর দিকে সরল সহজ নির্দোষ চোখে তাকাতে পারলুম না। পারব কি ক'রে? আমার মন তখন কলুষিত, বিষাক্ত আফিং খোর কিংবা মাতালকে যেমন তার চোখ মুখ দেখে, তার হাব ভাব দেখে চেনা যায়, কেউ নজর করে দেখলে আমারও ভেতরের পাপ প্লে; দেখতে পেত। চরিব্রহীনতা কিছুদিন চেপে রাখা যায় বটে, সবাইরে সাধুতা দেখান হয়ত সম্ভব হতে পারে, কিন্তু এটা! ঠিক যে ভও্ামিদ্বারা মনকে ফাকি দিতে পারা যায় না। মনে যখন পাপ ঢোকে তখন আর মানুষ নারীকে, মা বা ভথ্নী মনে ক'রে তার সঙ্গে মিশতে পারে না। ভ্রাতা ভগিণীর পবিভ্রভাব অন্ত নারীর সঙ্গে সে আর রক্ষা করতে পারে না। আমিও পারি নি। তাই আমিও হয়ে পড়লুম নিতাস্ত চরিত্রহীন, নিতান্ত লম্পট আমার সর্বনাশ হ'ল।”

রে

একটু থামিয়া আবার তিনি বলিতে লাগিলেন, “আমি এর পর থেকে অধঃপতনের নিমনতম স্তরের দিকে ক্রমাগত নেমে যেতে লাগলুম। ভাল হওয়ার কোন চেষ্টা করতে গেলেই বন্ধুর! আমায় বিক্রুপ বাণে বিদ্ধ করত। সেনাবিভাগের অনেক বড় বড় কর্মচারী, বহু উচ্চ শিক্ষিত যুবকের কীর্ডির কথা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, মশায় একেবারে অবাক হবেন। যাই হোক, এমনি করেত আমার দির্ন যেতে লাগল। এই ভীষণ ছুর্নীতি, এই চরিত্রহীনতার তেতর দিয়ে বড় হয়ে আমার বয়েস হ'ল তিরিশ। মজা এই এত ভীষণ ছুষিত অন্তর নিয়েও আমর! ভাল ভাল কাপড় চৌপড় পরে সেজেগুজে, পোষাকে আতর ছড়িয়ে ফিট ফাট হয়ে একেবারে দস্তূর মত তদ্রলোক হয়ে কত মজলিসে, কত নাচ ঘরেই না গেছি। ভেতরের পক্কিল আত্মাকে সাদ! ধব্‌ ধবে কাপড় চোপড় দিয়ে ঢেকে লোককে ফীকি,দিতেম।

“সত্যি যে ব্যাপার চলেচে তার সঙ্গে যা! হওয়া উচিত তার একবার তুলন। ক'রে দেখুন দেখি। যা৷ হওয়া! উচিত বলে মনে করি ত1 আপনাকে বলচি শুন্ুন। ন্যাকামি-_ভাগামির চেয়ে সোজা কথা ঢের তাল, ত৷ প্রিয়ই হোক আর অপ্রিয়ই হোক্‌। যা! গহিত বলে মনে হবে, তা যেই করুক না কেন তাকে স্পষ্ট সেটি বলে দিয়ে বিদায় করতে হবে। আমিত এই বুঝি। ধরুন আমার মত চরিত্রহীন কোন ধুবক যদি আমার বাড়ীতে আসে, আমার বোন বা মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তা কয়, মেলামেশা! করে, তা হলে আমার কি করা উচিত?

৩৩ সবরের আগুন

আমার উচিত হচ্ছে তার কাছে গিয়ে তাকে চুপ করে ডেকে নিয়ে বলা, “ভাই, তুষি যে চরিত্রের লোক তা৷ আমি ভানি। তুমি কার সঙ্গে কি রকমে সময় কাটাও তাও আমার অজানা! নেই, এটা তোমার যোগ্য স্থান নয়। আমার ভগ্মী, কন্তা। পবিত্র চরিব্র। এখান থেকে স'রে পড় বিদেয় হও শীগ্গীর।” এমনি ক'রে স্পষ্ট বলে দেওয়া! উচিত। তাত কেউ বলেনা, কাজেই, -মানুষ ভাল হয় কোথেকে ? লোকে যা করে তা হচ্ছে এই-_যদি এই রকম লোক বাড়ীতে আসে আর সে যদি খুব ধনী হয়, তাকে অত্যন্ত আদর আপ্যায়িত কর! হয়, ভ্মী বাঁ কন্ঠার সঙ্গে যাতে সে মেলামেশা করে তারই চেষ্টা করা হয়। মেয়েদের সঙ্গে তাকে বেড়াতে দেখ! হুয়, ঘনিষ্ঠতার সুযোগ দেওয়া হয়। কি লজ্জার কথা! ছিঃ ছিঃ কি.ঘেন্নার কথা। সে দিন কবে আসবে যে দিন মানব সমাজ থেকে এই বীভৎস নিলজ্জতা, এই দ্বণিত ছুর্নীতি একেবারে লোপ পাবে ?”

এই বলিয়াই তিনি কয়েকবার আসিয়া একটু এদিক ওদিক পায়চারি করিলেন এবং চা চালিয়। খানিকটা ' খাইলেন। চায়ের রংটা তখন একেবারে কালো হুইয়! গিয়াছে, এত ভয়ানক কড়া! তার কাছে একটু জলও ছিল না যে খানিকটা মিশাইয়া চা! পাৎলা করিয়া লইবেন। আমি ছুইবার যে চা খাইয়াছিলাম তাতেই আমার সমস্তটি শরীর একেবারে গরম হুইয়াই ছিল, ঘুমত একেবারেই চলিয়া গিয়াছিল। মোট কথা ওরকম কড়া চা জন্মে কখনো থাই নাই। তিনিও যে এতটা উত্তেজিত,হইয়াছিলেন তার মূলেও যে এই চায়ের খানিকটা গুণ নাই তা নয়। তিনি যতই চা খাইতে লাগিলেন ততই বেশী উত্তেজিত হইতে লাগিলেন, আর তাঁর গলাও ততই গম্‌ গম্‌ করিতে লাগিল

স্ুয়ের আগুন ৩৪

তিনি যেন একটু ছট্‌ ফটু করিতেছিলেন। কখন বা টুপীটা মাথায় দিলেন, আবার খুলিয়া ফেলিলেন। তার মুখের চেহারাটা যে অদ্ভুত রকম বদ্লাইয়া গিয়াছিল, তা অন্ধকারেও বেশ বুঝিতে পারা গেল।

তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন, তিরিশ বছর বয়েস্‌ অবধি এমনি ভাবেই জীবন কাটাপুম। কিস্তু এত অধঃপতনের মধ্যেও বিয়ে করার ইচ্ছাটা আমি একেবারেই ত্যাগ করিনি। এই ইচ্ছাটি আমার বরাবরই ছিল। মনে করেছিনুম বিয়ে করে ভাল হয়ে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মহাস্থখে দিন কাটাব। এই উদ্দেশ্ত সাধনের জন্য মনের মত একর্টি যুবতীর সন্ধান করতে লাগ্লুম।

পভাবলুম আমার স্ত্রী হওয়াত সোজা কথা নয়। তার তেমনি গুণ থাকতে চাই। আমি যাঁই হইনা' কেন তার চরিত্রটি একেবারে নিখুঁত হওয়া চাই-ই। অনেক দেখে বেড়ালুম, কাউকেই পছন্দ হ'ল না। শেষে একজনকে পছন্দ হ'ল। তাবলুম আমার স্ত্রী হওয়ার গৌরব একে দেয়৷ যেতে পারে।

*সে ছিল এক জমিদারের মেয়ে। জমিদার প্রথম জীবনে খুব : ধনীই ছিলেন বটে, তবে শেষটায়